সুনীল
২৪ অক্টোবর ২০১২, মহানবমীর দিন ইন্দ্রপতন। অকস্মাৎ চলে
গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। শরীর ভাল যাচ্ছেনা শুনেছিলাম। প্রত্যেক মঙ্গলবার
আনন্দবাজারে লিখতেন, ‘যা দেখি যা শুনি একা একা কথা বলি’। কয়েক সপ্তাহ আগে
জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছেন অন্তিম সময়ের জন্য।
এও জানিয়েছিলেন যে মরণোত্তর জীবনে বিশ্বাস করেন না; আত্মা বলে কোনও কিছুর
অস্তিত্ত্ব স্বীকার করেন না। মনটা বিষাদগ্রস্থ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৩৪ সালে জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে। দেশভাগের সময়
সপরিবারে চলে আসেন এদিকে। সৃষ্টিশীল মন, ১৯৫২ সালে, আঠেরো বছর বয়সে, কয়েকজন বন্ধুর
সঙ্গে মিলে বের করেন এক কবিতার ম্যাগাজিন, ‘কৃত্তিবাস’। ত্রৈমাসিক থেকে মাসিক।
নিজেও সম্পাদনা করেছেন। সেই কিশোর বয়সের এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তবে কৃত্তিবাসের জন্মলগ্নে আমি নিতান্তই বালক। আমার
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। সুনীলের প্রথম
সাড়া জাগানো সৃষ্টি। উপন্যাসের চরিত্রগুলি ভীষন পরিচিত মনে হয়েছিল। সেই শুরু।
তারপর একের পর এক লিখেছেন অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস। তার মধ্যে কয়েকটি তো ধ্রুপদী
সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে তিনটি বিশেষ উপন্যাসকে আমার ব্যক্তিগত
সংগ্রহের মধ্যে অমূল্য বলে মনে করি; - ‘সেই সময়’, ‘পুর্ব পশ্চিম’ এবং ‘প্রথম আলো’।
সত্যজিৎ রায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ নিয়ে ছবি করেছিলেন।
নানা পুরস্কার পেয়েছেন জীবনে। আনন্দ পুরস্কার, বঙ্কিম
পুরস্কার এবং সাহিত্য আকাদমি পুরস্কার। মৃত্যুকালে সাহিত্য আকাদমির সভাপতি ছিলেন।
সুনীল কিন্তু অনেক বার বলেছেন যে তাঁর প্রথম প্রেম কিন্তু কবিতা। নিজেকে কবি বলে
ভাবতেই ভালবাসতেন। তাঁর কাব্যে বারবার এক রহস্যময়ী নারীর আবির্ভাব হয়েছে, যার নাম
নীরা। কে এই নীরা? কোনও রক্তমাংসের নারী না কি কোনও কাল্পনিক সুন্দরী? জিজ্ঞাসা
করা হলে মৃদু হাসতেন। এক নিখিলেশও এসেছে তাঁর কবিতায়। সেটা কি তিনি নিজে? তারও
কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
ছোটোরাও বঞ্চিত
হয়নি। কাকাবাবু ও সন্তু মাতিয়ে রেখেছে এক নতুন প্রজন্মকে। এর মধ্যে ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ এবং ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে।
আটাত্তর বছর বয়সে চলে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সঙ্গে
নিয়ে গেলেন এক সাতাশ বছরের এক তরুণ যুবককে। সেই যুবক একদিন আমার সমবয়সী ছিল। তার
‘চোখের সামনে’ ঘটা অভিজ্ঞতার কথা যখন পড়তাম, মনে হত, ‘আ রে, এ তো আমার জীবনের
ঘটনা, ও জানল কি করে?’
কালের নিয়মে আজ আমি প্রবীন নাগরিক। কিন্তু নীললোহিত এখনও
সাতাশ। এখনও সে ঘুরে বেড়ায় গ্রামে গঞ্জে, শহরতলিতে। কাঁধে ঝোলা, চোখে মুখে স্বপ্ন
আর পকেটে গড়ের মাঠ। একদিন ভাবতাম দেখা হয়ে যাবে কোথাও। হয়তো কোনও দ্বিতীয় শ্রেণীর
কামরায় বা অটো রিক্সার পাশের সীটে বা কোনও ছোট্ট শহরের বাস স্ট্যান্ডে। কিন্তু এখন
মনে হয় আর দেখা হবে না। নীললোহিত চলে গেছে; কোথায় কেউ জানেনা। বোধহয় দিকশূন্যপুরে,
যার ঠিকানা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়ে যান নি কাউকে। কিংবা হয়তো এমন এক রাজ্যে যার
ঠিকানা তিনি নিজেও জানেন না।
আত্মায় বিশ্বাস করতেন না, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু
আমি করি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।
******
